মুসলিম আইনে উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টন

মুসলিমদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা নিসায় স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। কুরআনের আয়াত ও হাদিসের ভিত্তিতে দেশে মুসলিম আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কুরআন, হাদিস ও দেশে চলমান আইনের আলোকে মুসলিমদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের পদ্ধতি কয়েকটি ধাপে নিম্নে আলোচনা হলো-

.

মৃত ব্যক্তি যে সকল সম্পত্তি রেখে গিয়েছেন প্রথমে সেগুলো একত্রে হিসাব করতে হবে। যেমন-

১। জমি বা ভূমি (Land)

২। বাড়ি বা ফ্ল্যাট (House or flat)

৩। নগদ টাকা (Cash)

৪। স্বর্ণ বা রূপা (Ornaments)

৫। ব্যবসায়িক সম্পদ (Business property)

৬। অন্যান্য (Others) ইত্যাদি।

.

 কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী ফরায়েজে সম্পত্তি বন্টনের পূর্বে অবশ্যই নিম্নের চারটি কাজ সম্পন্ন করে নিতে হবে।

১। দাফন-কাফনের খরচ।

২। ঋণ পরিশোধ।

৩। ওসিয়ত বা উইল কার্যকর করা।

৪। মোহরানা পরিশোধ।

[সূরা নিসা: আয়াত ১১–১২]

১। দাফন-কাফনের খরচ- মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে তার জানাজা এবং দাফন-কাফনের খরচ মেটাতে হবে। 

২। ঋণ পরিশোধ-  মৃত ব্যক্তির কোন ঋণ (ব্যক্তিগত বা ব্যাংকসহ যেকোন দেনা) থাকলে উহা তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করতে হবে। 

৩। ওসিয়ত বা উইল কার্যকর করা-  মৃত ব্যক্তি কোন ওসিয়ত বা উইল করে গেলে তা কার্যকর করতে হবে। তবে ওসিয়ত বা উইল মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩ অংশের বেশি ওয়ারিশের পক্ষে অন্যান্য ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া ওসিয়ত করা যাবে না। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৭৪২]

৪। মোহরানা পরিশোধ- স্ত্রীর মোহরানা বাকি থাকলে তা পরিশোধ করতে হবে (ইহাও ঋণের অন্তর্ভুক্ত)।

উপরোক্ত কার্যাদি শেষে সম্পত্তির বাকি অংশই ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

.

ওয়ারিশদের মধ্যে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বন্টোনের পূর্বে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়দেরকে তিন ভাবে ভাগ করা হয়। যথা-

ক। অংশিদার (Sharer) / ১ম শ্রেণীর ওয়ারিশ

খ। অবশিষ্টভোগী (Residuary) / ২য় শ্রেণীর ওয়ারিশ

গ। দূরবর্তী আত্মীয়গণ (Distant Kindred) / ৩য় শ্রেণীর ওয়ারিশ

প্রথমে অংশিদার (Sharer) দের মধ্যে সম্পত্তি বন্টন করতে হবে। তারপর সম্পত্তি থেকে গেলে কিংবা অংশিদার কেউ না থাকলে অবশিষ্টভোগী (Residuary) দের মধ্যে সম্পত্তি বন্টন করতে হবে। অংশিদার এবং অবশিষ্টভোগী কেউ না থাকলে দূরবর্তী আত্মীয়গণ (Distant Kindred) মধ্যে সম্পত্তি বন্টন করতে হবে।   

.

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা নিসায় অংশিদার দের তালিকা তাদের অংশসহ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। পবিত্র কুরআন অনুযায়ী অংশিদারগণ মোট ১২ জোন।

পুরুষ অংশিদার- ১। স্বামী, ২। পিতা, ৩। দাদা, ৪। বৈপিত্রেয় বোন (Uterine Brother)।

নারী অংশিদার- ৫। স্ত্রী, ৬। মাতা, ৭। দাদী, ৮। কন্যা, ৯। পুত্রের কন্যা, ১০। সহোদর বোন (Full Sister), ১১। বৈমাত্রেয় বোন (Consanguine Sister) , ১২। বৈপিত্রেয় বোন (Uterine Sister)।      

ক্রমিকঅংশিদারগণ  ক্ষেত্রসমূহঅংশ
১।স্বামীসন্তান থাকলে  ১/৪
  সন্তান না থাকলে ১/২
২।স্ত্রী  সন্তান থাকলে ১/৮
  সন্তান না থাকলে ১/৪
৩।পিতাসন্তান থাকলে১/৬
  কন্যা থাকলে ও পুত্র না থাকলে কন্যার অংশ দেওয়ার পর১/৬ + অবশিষ্টভোগী
  সন্তান না থাকলে  ১/৬ + অবশিষ্টভোগী
৪।মাতাসন্তান বা একাধিক ভাই-বোন থাকলে১/৬
  সন্তান বা একাধিক ভাই-বোন না থাকলে১/৩
৫।দাদাপিতা না থাকলে পিতা থাকলেপিতার ন্যায় পাবে বঞ্চিত হবে
৬।দাদীমাতা না থাকলেমাতার ন্যায়
  মাতা থাকলে  বঞ্চিত হবে
৭।কন্যাএকজন হলে১/২
  একাধিক হলে২/৩
  পুত্র থাকলে পুত্রের সাথে অবশিষ্টভোগী হবে  ছেলে : মেয়ে= ২ : ১
৮।পুত্রের কন্যাকন্যা না থাকলেকন্যার ন্যায় পাবে  
  কন্যা থাকলেবঞ্চিত হবে
৯।সহোদর বোনপুত্র এবং ভাই না থাকলে   
  একজন হলে১/২
  একাধিক হলে২/৩
  পুত্র না থাকলে এবং ভাই থাকলে ভাইয়ের সাথে অবশিষ্টভোগী হবেভাই : বোন= ২ : ১ 
  পুত্র বা পিতা থাকলে বঞ্চিত হবে  
১০।বৈমাত্রেয় বোনপুত্র, পিতা বা দাদা থাকলে  
  একজন হলে১/২
  একাধিক হলে২/৩
  পুত্র, পিতা বা দাদা থাকলে বঞ্চিত হবে  
১১।বৈপিত্রেয় বোনএকজন হলে১/৬
  একাধিক হলে১/৩
  পুত্র, পিতা বা দাদা থাকলে বঞ্চিত হবে  
১২।বৈপিত্রেয় ভাই।একজন হলে১/৬
  একাধিক হলে১/৩
  পুত্র, পিতা বা দাদা থাকলে বঞ্চিত হবে  
    

.

অংশিদার (Sharer) কেউ না থাকলে সমস্ত সম্পত্তি অবশিষ্টভোগী (Residuary) দের মধ্যে বন্টন করতে হবে। অংশিদার কেউ না থাকলে তাদের অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি অবশিষ্টভোগীদের মধ্যে বন্টন করতে হবে।   

অবশিষ্টভোগী (Residuary) দের তালিকা-

  • উত্তরপুরুষগণ (Descendants)-

১। পুত্র

২। পুত্রের পুত্র

  • পূর্বপুরুষ (Ascendants)-

৩। পিতা

৪। দাদা

  • পিতার উত্তরপুরুষগণ (Descendants of father)-

৫।  আপন ভাই

৬। আপন বোন   

৭। বৈমাত্রেয় ভাই

৮। বৈমাত্রেয় বোন

৯। আপন ভাইয়ের পুত্র

১০। চাচাত ভাইয়ের পুত্র / স্বগোত্রীয় ভ্রাতুষ্পুত্র

১১। আপন ভাইয়ের পুত্রের পুত্র

১২।  চাচাত ভাইয়ের পুত্রের পুত্র / স্বগোত্রীয় ভ্রাতুষ্পুত্রের পুত্র

১৩। আপন চাচা

১৪। বৈমাত্রেয় চাচা

১৫। আপন চাচার পুত্র

১৬। বৈমাত্রেয় চাচার পুত্র

১৭। আপন চাচার পুত্রের পুত্র  

১৬। বৈমাত্রেয় চাচার পুত্রের পুত্র  

.

মৃত ব্যক্তির অংশিদার (Sharer) বা অবশিষ্টভোগী (Residuary) কেউ জীবিত না থাকলে মৃত ব্যক্তির ত্যক্ত সম্পত্তি দূরবর্তী আত্মীয়গণ (Distant Kindred) এর মধ্যে বন্টন করতে হবে।   

মৃত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী একমাত্র অংশিদার (Sharer) হিসাবে জীবিত থাকলে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ দেওয়ার পর বাকি অংশ সম্পত্তি দূরবর্তী আত্মীয়গণ (Distant Kindred) এর মধ্যে বন্টন করতে হবে।   

.

দূরবর্তী আত্মীয়গণ (Distant Kindred) এর তালিকা-

দূরবর্তী আত্মীয়/জ্ঞাতি ওয়ারিশগণকে চার শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। যথাঃ 

(ক) মৃত ব্যক্তির অংশীদার ও অবশেষ প্রাপক বংশধরগণ ব্যতীত অন্যান্য উত্তরপুরুষগণ;

(খ) মৃত ব্যক্তির অংশীদার ও অবশেষ প্রাপক ব্যতীত অন্যান্য পূর্বপুরুষগণ;

(গ) অংশীদার বা অবশেষ প্রাপক ব্যতীত মৃত ব্যক্তির পিতা-মাতার বংশধরগণ;

(ঘ) মৃত ব্যক্তির পূর্বপুরুষের বংশধর যতই ঊর্ধ্বগামী হোক, যারা অবশেষ প্রাপক নহে। মৃত ব্যক্তির বংশধরগণ ওয়ারিশ হিসেবে পূর্বপুরুষদের উপর অগ্রাধিকার লাভকরে সম্পত্তিতে অংশ গ্রহণ করে, আবার মৃত ব্যক্তির পূর্বপুরুষগণ তার পিতা-মাতার বংশধরদের উপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনুরূপে অংশ লাভ করে।

.

নিম্নে উপরোক্ত চার শ্রেণীর দূরবর্তী জ্ঞাতি ওয়ারিশদের প্রত্যেকের একটি তালিকা প্রদত্ত হলোঃ

ক।  মৃত ব্যক্তির বংশধরগণঃ

(১) কন্যার সন্তান-সন্ততিগণ ও তাদের বংশধরগণ।

(২) পুত্রের কন্যার সন্তান-সন্ততি যতই নিম্নগামী হোক ও তাদের বংশধরগণ।

খ। মৃত ব্যক্তির পূর্বপুরুষগণঃ

৩। অপ্রকৃত পিতামহ ও এর ঊর্ধ্বগামী পূর্বপুরুষগণ।

৪। অপ্রকৃত পিতামহী ও এর উর্ধ্বগামী মহিলা জ্ঞাতিবৃন্দ।

গ। পিতার-মাতার বংশধরগণঃ

৫। সহোদর ভাইয়ের কন্যাগণ ও তাদের বংশধরগণ।

৬। বৈমাত্রেয় ভাইয়ের কন্যাগণ ও তাদের বংশধরগণ।

৭। বৈপিত্রেয় ভাইয়ের সন্তান-সন্ততি ও তাদের বংশধরগণ।

৮। সহোদর ভাইয়ের পুত্রের কন্যাগণ যতই নিম্নগামী হোক ও তাদের বংশধরগণ।

৯। বৈমাত্রেয় ভাইয়ের পুত্রের কন্যাগণ যতই নিম্নগামী হোক ও তাদের বংশধরগণ।

১০। বোনগণের (সহোদরা, বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয়) সন্তান-সন্ততি ও তাদের বংশধরগণ।

ঘ। নিকটতম পিতামহ-মাতামহী (প্রকৃত ও অপ্রকৃত)-দের বংশধরগণঃ

১১। সহোদর চাচার কন্যাগণ এবং তাদের বংশধরগণ।

১২। বৈমাত্রেয় চাচার কন্যাগণ ও তাদের বংশধরগণ।

১৩। বৈপিত্রেয় চাচা ও তাদের সন্তান-সন্ততি এবং তাদের বংশধরগণ।

১৪। সহোদর চাচার পুত্রগণের কন্যাগণ-যতই নিম্নগামী হোক ও তাদের বংশধরগণ।

১৫। বৈমাত্রেয় চাচার পুত্রগণের কন্যাগণ-যতই নিম্নগামী হোক ও তাদের বংশধরগণ।

১৬। সহোদরা, বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয় ফুফুগণ এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ও তাদের বংশধরগণ।

১৭। মামা, মামী ও তাদের সন্তান-সন্ততি এবং তাদের বংশধরগণ।

.

প্রয়োজনে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

যোগাযোগ

সার্বিক পরিচালনায়- এডভোকেট মুহাম্মদ মহীউদ্দীন

এলএল.বি, এলএল.এম, এমবিএ

২/১, কোর্ট হাউজ স্ট্রিট, ঢাকা জজ কোর্ট, কোতোয়ালী, ঢাকা।

অথবা

রোড-৫, ব্লক-এ, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা।

ফোন- 01711068609 / 01540105088

ওয়েবসাইট- www.ainbid.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *