হাইকোর্টে রিট করার নিয়ম

.

রিট বা Writ শব্দটি পুরাতন ইংরেজি (Old English) শব্দ ‘Writan’ থেকে এসেছে যার অর্থ হলো ‘লেখা’ বা ‘খোদাই করা’ বা To Write

মধ্যযুগে ইংল্যান্ডের রাজার লিখিত আদেশ বা ফরমানকে ‘Writ’ বলা হতো। পরবর্তীতে আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় ইহা একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

.

Writ এর অভিধানিক অর্থ হলো “লিখিত আদেশ” বা “ফরমান”।

আইনের পরিভাষায়, রিট (Writ) হলো বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক নিম্ন আদালত বা সরকারি কর্তৃপক্ষকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক লিখিত নির্দেশ।

.

রিট এর নাধ্যমে আদালত কাউকে কোনো আইনি দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দিতে পারেন, অথবা আইন বহির্ভূত কোনো কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারেন।

.

হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করা হয় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুসারে। কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে উহার প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা যায়।

.

সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুসারে রিট পাঁচ প্রকার। যথা-

১। প্রোহিবিশন (Prohibition) — নিষেধাজ্ঞা বা প্রতিষেধ রিট- অর্থ “নিষেধ করা” বা “বারণ করা”

[Article 102(2)(a)(i)]

নিম্ন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা আধা-বিচারিক কর্তৃপক্ষ তাদের নির্ধারিত এখতিয়ারের (Jurisdiction) বাহিরে কোনো মামলার বিচার কাজ পরিচালনা করলে উচ্চ আদালত এই রিটের মাধ্যমে সেই বিচার কাজ বন্ধ করার বা স্থগিত (Stay) করার নির্দেশ দিতে পারেন।

.

২। ম্যান্ডামাস (Mandamus) — পরমাদেশ বা হুকুম জারি রিট       [Article 102(2)(a)(i)]

সরকারি কর্মকর্তা, নিম্ন আদালত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা (যেমন: ওয়াসা, রাজউক, সিটি কর্পোরেশন) আইনগত দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকার বা অবহেলা করলে, আদালত এই রিটের মাধ্যমে সেই দায়িত্বটি পালন করার নির্দেশ দেন।

যেমন- নামজারির আবেদন করার পর কোন কারণ ছাড়া নামজারি করে না দিলে এসি(ল্যান্ড) অফিসের বিরুদ্ধে এই রিট করা যায়।

.

৩। সার্শিওরারি (Certiorari) — উৎপ্রেষণ রিট -অর্থ “অধিকতর নিশ্চিত হওয়া” বা “অবগত হওয়া”

[Article 102(2)(a)(ii)]

নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে ইতিমধ্যে কোনো রায় বা আদেশ দিয়ে ফেললে, কিংবা প্রাকৃতিক ন্যায়নীতি (Natural Justice) লঙ্ঘন করে কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেললে সেই আদেশের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য এই রিট করা হয়। হাইকোর্ট এই রিটের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের মামলার নথি তলব করেন এবং ভুল বা বেআইনি প্রমাণিত হলে নিম্ন আদালতের সেই রায় বা আদেশকে বাতিল (Quash) করে দিতে পারেন।

প্রোহিবিশন ও সার্শিওরারির পার্থক্য:

প্রোহিবিশন নির্দেশ দেওয়া হয় বিচার চলাকালীন কাজ থামানোর জন্য, আর সার্শিওরারি নির্দেশ দেওয়া হয় বিচার সমাপ্ত হবার পর ভুল রায় বাতিল (Quash) করার জন্য।

.

৪। হেবিয়াস কর্পাস বা Habeas Corpus (Have the body) — বন্দী প্রদর্শন রিট [Article 102(2)(b)(i)]

কোনো ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে আটক করা হলে এই রিট করা হয়। আদালত এই রিটের মাধ্যমে পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেন আটক ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার জন্য এবং কোন আইনে আটক করা হয়েছে তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। আটক রাখা বেআইনি প্রমাণিত হলে আদালত তাকে অবিলম্বে মুক্তির আদেশ দেন।

.

৫। কো-ওয়ারেন্টো বা Quo-Warranto (By what authority?)- কারণ দর্শাও রিট। অর্থ “কোন ক্ষমতাবলে?” [Article 102(2)(b)(ii)]

কোনো ব্যক্তি সরকারি কোনো অফিস (যেমন: কোনো লাভজনক সরকারি পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা পাবলিক পর্ষদের পদ) অবৈধভাবে দখল করে রাখলে, এই রিটের মাধ্যমে আদালত “কোন ক্ষমতাবলে” ঐ পদে বহাল আছেন তা জানতে চাইতে পারেন। ঐ ব্যক্তি তার পদের বৈধতা প্রমাণ করতে না পারলে আদালত ঐ পদটি শূন্য ঘোষণা করেন।

.

এই পাঁচ ধরণের রিটের মধ্যে Prohibition, Mandamus এবং Certiorari করতে পারবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি (Aggrieved person)। অর্থাৎ শুধুমাত্র সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরই এই ধরণের রিট করার অধিকার বা Locus Standi আছে।

কিন্তু Habeus Corpus এবং Warranto এই দুই ধরণের রিট করতে পারবে যেকোন ব্যক্তি (Any person)। অর্থাৎ এই দুই ধরণের রিট শুধুমাত্র সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিই নয় বরং যেকোন ব্যক্তিরই এই রিট করার অধিকার বা Locus Standi আছে।

.

সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোন আদালত, সরকার কিংবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রিট করা যায়।

.

কাহারো মৌলিক অধিকার লংঘিত হলে উপরোক্ত পাঁচ ধরণের রিটের মধ্যে যেটি প্রয়োজন সেটি শুধমাত্র সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্টে বিভাগে করতে হয়। রিট করার জন্য কয়েকটি ধাপ অবলম্বন করতে হয়। এই ধাপসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো-

.

রিট করার আগে সাধারণত সংশ্লিষ্ট সরকারি বা বেসরকারি কর্তৃপক্ষকে একটি রেজিস্টার্ড ডাকযোগে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হয়। নোটিশে আপনার দাবি পূরণের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় (যেমন: ৭ থেকে ১৫ দিন) দেওয়া হয়। তারা যদি এই সময়ের মধ্যে জবাব না দেয় বা ব্যবস্থা না নেয়, তাহলেই রিট করার একটি ভিত্তি তৈরি হয়। কোন জরুরি ক্ষেত্রের সৃষ্টি হলে নোটিশ না দিয়েও রিট করা যেতে পারে।

.

মহামান্য হাইকোর্টের একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে মামলার সকল তথ্য, লিগ্যাল নোটিশের কপি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংযুক্ত করে একটি রিট পিটিশন ড্রাফট (Draft) করতে হবে। এই পিটিশনের সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য হাইকোর্টের কমিশনারের সামনে একটি Affidavit (হলফনামা) সম্পাদন করতে হয়।

.

Affidavit (হলফনামা) সম্পাদনের পর প্রয়োজনীয় কোর্ট ফি দিয়ে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় (Section) রিটটি ফাইল করতে হয় বা জমা দিতে হয়। ফাইলিং শেষ হলে মামলাটি শুনানির জন্য একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চের কার্য তালিকায় (Cause List) অন্তর্ভুক্ত হয়।

.

বিজ্ঞ আইনজীবী আদালতে রিটের পক্ষে প্রাথমিক শুনানি করবেন। আদালত সন্তুষ্ট হলে অপর পক্ষকে (Respondent) কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবেন, যাকে আইনি ভাষায় রুল নিশি (Rule Nisi) বলা হয়। একই সাথে আদালত প্রয়োজন মনে করলে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ (Stay Order) বা নির্দেশনাও দিতে পারেন।

.

অপর পক্ষ রুলের জবাব (Affidavit-in-Opposition) দাখিল করার পর মামলাটি চূড়ান্ত শুনানির জন্য আসে। উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত রুলটি ‘অ্যাবসলিউট’ (Rule Absolute) বা কার্যকর করে চূড়ান্ত রায় দিতে পারেন, অথবা রিটটি খারিজ (Discharge) করে দিতে পারেন।

.

১। মূল ঘটনার পক্ষে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ এবং দালিলিক কাগজপত্র (যেমন: সরকারি কোন আদেশ, নামজারি খতিয়ান, বা কোনো চিঠিপত্র)।

২। লিগ্যাল নোটিশ এবং তার প্রাপ্তি রসিদ (Acknowledgment Receipt)।

৩। জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং পাসপোর্ট সাইজ ছবি (হলফনামার জন্য)।

৪। বিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতাপত্র বা ওকালতনামা।

.

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

সাধারণ কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলায় নিম্ন আদালতের কোনো আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিশন করার আইনি পথ খোলা থাকলে সরাসরি রিট করা যায় না। তবে অন্য কোনো কার্যকর আইনি প্রতিকার (Equally Efficacious Remedy) না থাকলে সেইক্ষেত্রে রিট দায়ের করা যায়।

.

যেকোন আইনগত সহায়তার জন্য

মুহাম্মদ মহীউদ্দীন

এডভোকেট

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

০১৭১১০৮৬০৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *